সিসি ডেস্ক: এবার বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইউরোপে কার্গো পণ্য রফতানিতে বাধ সেধেছে ব্রিটিশ এভিয়েশন গোয়েন্দা দল। ‘এয়ার কার্গো সিকিউরিটি (এসিসি)-৩’ ও ‘রেগুলেশন এজেন্ট (আরএ)-৩’ সনদ নবায়নে ৩টি শর্ত বেঁধে দিয়েছে তারা। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক এয়ার টান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) সনদ দুটি বাতিল করে দেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সনদ দুটি নবায়ন না হলে বিমান বছরে ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। আর যদি পুরো কার্গো সেক্টরের ওপর এ খড়গ আরোপ হয় তাহলে বাংলাদেশ থেকে বছরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার কার্গো রফতানি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
ইউরোপে সরাসরি কার্গো পণ্য রফতানি করতে প্রত্যেক দেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এসিসি-৩’ ও আরএ-৩’ সনদ নিতে হয়। এয়ারলাইন্সের জন্য এসিসি-৩ আর হ্যান্ডেলিং এজেন্টের জন্য নিতে হয় আরএ-৩ সনদ। দীর্ঘদিন ধরে নানা তদবির করে বাংলাদেশ বিমান ও বিমানের কার্গো হ্যান্ডেলিং এজেন্ট ২০১৪ সালে এক বছরের জন্য সনদ দুটি পায়। নানা শর্ত পূরণ সাপেক্ষে যুক্তরাজ্যের ট্রান্সপোর্টেশন এজেন্সি এ সনদ দেয়। ৩১ ডিসেম্বর সনদ দুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় গত সপ্তাহে সরেজমিন তদন্ত করে ব্রিটিশ এভিয়েশন গোয়েন্দা দল। সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, তদন্ত শেষে ইউরোপে কার্গো রফতানি অব্যাহত রাখা এবং সনদ দুটি নবায়ন করতে বাধ্যতামূলক ৩টি শর্ত দিয়েছে ব্রিটিশ এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ দল। এগুলো হল : কার্গো কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা জোরদার, নিজস্ব জনবল নিয়োগ ও দক্ষ স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর নিয়োগ। দু’দিনের তদন্ত শেষে তারা শাহজালাল আন্তজাতিক বিমানবন্দরের সিকিউরিটি ও যাত্রী অপারেশনে কিছুটা সন্তোষ প্রকাশ করলেও কার্গোসহ পুরো বিমানবন্দরের স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরদের দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে বিমানের কার্গো কমপ্লেক্সের আমদানি শাখার জনবল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও রফতানি শাখার জনবল নিয়ে চরম অসন্তোষ জানিয়েছে। তারা বলেছে, কার্গো পণ্য রফতানি শাখার অধিকাংশ জনবলই বিমানের নিজস্ব নয়। বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণভাবে কার্গো রফতানি শাখাটি পরিচালনা করছে। বিমান ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব জনবলকে কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। বিমান কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে বিভিন্ন শাখা থেকে জনবল ধার করে এনে রফতানি শাখা পরিচালনা করছে। সিভিল এভিয়েশন থেকে নামকাওয়াস্ত নিরাপত্তা পাস নিয়ে এরা কার্গো কমপ্লেক্সে প্রবেশ করছে। এরপর অবলীলায় বিমানবন্দরের যে কোনো স্পর্শকাতর স্থানে চলে যাচ্ছে।
এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জনবল নিয়ে রফতানি শাখা পরিচালনা অব্যাহত থাকলে এসিসি-৩ ও আরএ-৩ সনদ নবায়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সুপারিশ করবে না বলেও ব্রিটিশ এভিয়েশন টিম জানিয়ে দিয়েছে সিভিল এভিয়েশনকে।
এ ছাড়া বিমানবন্দরের যাত্রীদের স্ক্যানিংসহ কার্গো কমপ্লেক্সের স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, শাহজালালের স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরদের অধিকাংশই কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। অনেকে জাল সার্টিফিকেট ও ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে নিয়োগ নিয়েছেন। ক্যান্টিন বয় থেকে স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর হওয়ার নজিরও তাদের কাছে আছে। বিভিন্ন মামলা-মোকাদ্দমার আসামি ও আন্তর্জাতিক চোরাচালানিদের সঙ্গেও এদের সখ্য আছে। বিমানবন্দরের ক্লিনার ও লোডার হিসেবে ঢুকে পরবর্তীকালে স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর হয়েছেন অনেকে। ব্রিটিশ টিম জানিয়েছে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিমানের কার্গো রফতানি শাখাকে নিজস্ব জনবলের আওতায় না আনলে বিমানের পক্ষে এসিসি-৩ সনদ নবায়ন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, শাহজালালে স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর বলতে কোনো পদ নেই। মূলত নিরাপত্তা অপারেটররাই এসব মেশিন চালান। আর অপারেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন নিরাপত্তা সুপারভাইজাররা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিভিল এভিয়েশনের কমপক্ষে ২০ জন নিরাপত্তা অপারেটর আছেন যারা স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরের দায়িত্ব পেয়ে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। অভিযোগ আছে, ডিউটি রোস্টার তৈরির সময় স্ক্যানিং মেশিন অপারেটরের ডিউটি নিতে হাজার হাজার টাকা ঘুষ দেন নিরাপত্তা অপারেটররা। আন্তজাতিক চোরাকারবারির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে প্রায়ই এরা লাগেজের মধ্যে থাকা বিদেশী মুদ্রা, সোনার চালান, মাদক ও অবৈধ জিনিষপত্র ছেড়ে দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) একজন কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মাসে গড়ে ১০-২০টি অবৈধ চালান আটক করা হয় যেগুলো স্ক্যানিং মেশিনে ধরা পড়ছে না। অভিযোগ আছে, নিরাপত্তা অপারেটর জাহাঙ্গীর আলম (বগুড়া) একসময় ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থিত পিয়ন মতির চায়ের দোকানের বয় ছিলেন। বর্তমানে তিনি শাহজালালে যাত্রীদের লাগেজ স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া নিরাপত্তা অপারেটর শামীম, প্রতুল চন্দ্র দাশ, শাহাদাত হোসেন শাহীন, পারভেজের বিরুদ্ধেও লাগেজ স্ক্যানিং নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ আছে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকায় ফজলুর রহমান নামে একজন নিরাপত্তা অপারেটরকে মারধর পর্যন্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর। এ ছাড়া স্ক্যানিং মেশিন মনিটরিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত আবদুল হামিদ, আবদুল হাকিম ও নাজমা চৌধুরীর বিরুদ্ধেও অসংখ্য অভিযোগ আছে।
বিমানের কার্গো কমপ্লেক্সের রফতানি শাখায় বহিরাগতদের প্রবেশ প্রসঙ্গে ওই শাখার জেনারেল ম্যানেজার আলী আহসান বাবু বলেন, ইতিমধ্যে ব্রিটিশ টিমের অধিকাংশ শর্ত পূরণ করা হয়েছে। বর্তমানে কার্গো আমদানি শাখাটি সম্পূর্ণ বহিরাগতমুক্ত। বিমানের নিজস্ব জনবল না থাকায় সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা পাস নিয়ে রফতানি শাখাটি পরিচালনা করতে হচ্ছে।
বিমানের প্রশাসন শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থাকায় রফতানি শাখায় জনবল নিয়োগ করা যাচ্ছে না। তবে ইতিমধ্যে কার্গো রফতানি শাখার জন্য কি পরিমাণ জনবল লাগবে তা যাচাই-বাছাই করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী বোর্ডসভায় বিষয়টি এজেন্ডা আকারে উত্থাপন করা হবে। তার মতে, রফতানি শাখা বহিরাগতমুক্ত করতে হলে কমপক্ষে দেড়শ’ জনবল (লোডার) নিয়োগ দিতে হবে।
এসিসি-৩ ও আরএ-৩ সনদ নবায়ন প্রসঙ্গে জেনারেল ম্যানেজার আলী আহসান বাবু বলেন, এ দুটি সার্টিফিকেট নবায়নের জন্য সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকজন নিজস্ব জনবলও নিয়োগ দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। সিকিউরিটি ব্যবস্থাও আধুনিকায়ন করা হয়েছে।